বিস্তারিত

  • হোম
  • |
  • আমরা যেভাবে খাবারের রঙের নামে পোকা খাচ্ছি
thumb
আমরা যেভাবে খাবারের রঙের নামে পোকা খাচ্ছি
  • 12/21/2021 7:14:18 PM
  • মো: মোস্তাফিজার রহমান
  • 0 - Comments

একবার ভাবুনতো,  ভুলক্রমে কোনোভাবে যদি কোনো পোকা আমাদের মুখের ভেতরে চলে যায় তাহলে কী বাজে এক অভিজ্ঞতাই না হয় আমাদের! আমরা অথচ জানিই না যে দীর্ঘদিন ধরে আমরা এমন সব পোকা খাবার হিসাবে খাচ্ছি ও এমন সব অদ্ভূদ পোকার তৈরি পণ্য ব্যবহার করছি, না সরাসরি পোকার তৈরী পণ্য নয় কিন্তু, এইসব পোকা পণ্য রাঙাতে সরাসরি ব্যবহার করা হয়। আসুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক..

 

ধরুন কোনো ভালো রেস্তোরাঁয় বসেছেন খাবার খেতে। ভাত মুখে দিয়ে চিবোচ্ছেন আয়েশ করে আর ভাবছেন শর্ষে দিয়ে ইলিশটা বেশ ভালোই লাগছে।তারপর  হঠাৎ  ভাতের সঙ্গে ইলিশের ঝোল মাখাতে মাখাতে সাদা ভাতের ভিতর খুব কালো কিছু একটা আবিষ্কার করলেন। ভালো করে দেখার পর বুঝতে পারলেন যে আবিষ্কৃত কালো বস্তুটি আসলে পোকা ছাড়া অন্য কিছু নয়! ব্যস সব শেষ, খাবারটা আর নিচে নামছে না বরং গলায় গেল আটেকে। প্লেট সরিয়ে সোজা বেসিনের দিকে দৌড় দিলেন। আবার কেউ কেউ বেসিন তো দূরের কথা কোনো চিন্তা মাথায় আসার আগেই পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে  বের করে দেন  অনেকেই।

মোদ্দাকথা, খাবারে পোকা মানে হচ্ছে  চূড়ান্ত বিরক্তিকর এক বীভৎস অভিজ্ঞতা।

 

কিন্তু কি অদ্ভুত ব্যাপার, আসলে প্রতিনিয়তই আমরা  এমন কিছু প্রিয় খাবার গ্রহণ করি অথবা এমন কিছু পণ্য ব্যবহার করি যা কি না তৈরীতে ব্যবহৃত হয় পোকা।

ধরুন রেড ভেলভেট কেকের কথাই আলোচনা করা যাক। যারা নামটি  জানেন তাদের অনেকের জিবে নিচ্চই  এতক্ষনে জল এসে গেছে।  কিন্তু জানেন কি? এই কেক লাল করতে একধরনের পোকা ব্যবহার করা হয়! কি জিভের জল আছে না শুকিয়ে গেল? তাহলে আরো শুনুন, আমাদের চারদিকে মুখরোচক এরকম অনেক ধরনের খাবার যেমন, আইসক্রিম, চকলেট,  জেলি, জুস,  দই ইত্যাদি তৈরি করতে যে রং এর ব্যবহৃত করা হয়, তা মূলত তৈরী  বিশেষ এক পোকা থেকে।  শুধু খাবার কেন, প্রচলিত প্রসাধনী পণ্য সামগ্রী যেমন,  লিপস্টিক, শ্যাম্পু, আইশ্যাডো,  লোশনের মতো জিনিস তৈরিতেও ব্যবহৃত হয় বিশেষ এই পোকা থেকে তৈরী করা রং।  

 

প্রশ্ন আসতেই পারে কী সেই বিশেষ পোকা?

 

তবে জানেন কি? কিছু খাবার ও প্রসাধনি সামগ্রীতে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত লাল রঙের নাম হচ্ছে  কারমাইন। মূলত এটি  প্রস্তুত করা হয়

কোচিনিয়েল অথবা কোচিনিল নামের এক বিশেষ ধরনের পোকাকে পিষে। বিশ্বব্যাপী এই বিশেষ রং কারমাইনের অসম্ভব ধরণের চাহিদা রয়েছে। বিশেষত লাতিন আমেরিকার পেরু থেকে বিশ্ব বাজারের  কারমাইনের মোট জোগানের প্রায় ৯৫ শতাংশ আসে।  এই পেরুতে বিশাল এলাকা জুড়ে চাষ করা হয় এই কোচিনিয়েলের।

 

কারমাইন নামক এই বিশেষ রঙের জনপ্রিয়তার মূল কারণ - এই রং দীর্ঘদিনেও  নষ্ট হয় না।  এমনকি  এটি প্রচন্ড রোদেও খাবারের স্বাদে বা গন্ধে কোনো ধরণের পরিবর্তন আনে না।

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়  আনুমানিক  ৫০০ বছরেরও অনেক আগে থেকেই এই রং  খাবারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  কৃত্রিম রঙের চেয়ে  এই  পোকা থেকে তৈরী রং  অনেক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত বলে অনেকে মনে করেন।  কিন্তু সেইসাথে অনেকেই মনে করেন,  যেসকল পণ্যে এই কারমাইন ব্যবহার করা হয়, সেসকল  পণ্যের গায়ে স্পষ্টভাবে এই রঙের কথা উল্লেখ থাকা উচিত। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় এই রং ব্যবহার করে পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানি গুলো সরাসরি ‘কারমাইন’ এভাবে না লিখে  ‘প্রাকৃতিক লাল রং লিখেন, অনেকেই আবার  ‘ক্রিমসন লেক’, ‘ই১২০’, বা ‘প্রাকৃতিক রং’ ইত্যাদি এভাবে লিখেন। তবে  এখন প্রাকৃতিক বিভিন্ন  উৎস থেকে  এমন প্রাকৃতিক  রং সংগ্রহ করা হয়, যার সাথে কোনো পোকা বা কীটের সম্পর্ক নেই এবং  খাবারেও  ব্যবহারযোগ্য। যেমন আপনারা  বিটানিন নামে যে খাবারের রং এর ব্যবহারের কথা জানেন  তা মূলত বিটের মূল থেকে তৈরি হয়।

 

কারমাইন ও এর ইতিহাস নিয়ে  - "এমি বাটলার গ্রিনফিল্ড" নামের মার্কিন লেখক "আ পারফেক্ট রেড" নামক একটি বই লিখেছেন। তিনি মনে করেন,  যদি কোনো পণ্যে কারমাইন এর ব্যবহার হয়  তাহলে সেটি স্পষ্ট করে  তার প্যাকেটে উল্লেখ থাকা উচিত। তাঁর লেখা ভাষায়, ‘খাবারের রং হিসেবে কারমাইন দারুণ এক পণ্য এবং এটি গোলাপি,  লাল, বেগুনি, কমলা ইত্যাদি রং তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। কিছু মানুষের হয়তো এই রঙের প্রতি অ্যালার্জি আছে, কিন্তু আদতে এর কার্যকারিতা বেশ ভালো।’

 

"কোচিনিয়েল" নামক বিশেষ এই পোকাটি লম্বায় প্রায়  ৫মি.মি - ০.২ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাখা থাকায় উড়তে পারে পুরুষ কোচিনিয়েল কিন্তু স্ত্রী কোচিনিয়েলের পাখা না থাকায় উড়তেও পারে না।  মূলত কারমাইন নামক বিশেষ এই রং তৈরি হয়  স্ত্রী কোচিনিয়েল থেকে।

 

মূলত এই রং তৈরি হয় স্ত্রী কোচিনিয়েলে থাকা কারমাইনিক নামক অ্যাসিড থেকে।  স্ত্রী  কোচিনিয়েলকে ধাপে  ধাপে শুকোনোর পর রং তৈরি করা হয়। শুকানোর চূড়ান্ত ধাপে গিয়ে  শুধু রংটুকু রেখে  বাদ দেয়া হয়  পোকার শরীরের অবশিষ্ট পুরো অংশই।

 

কোচিনিয়েল কি নিরাপদ?

 

এমন প্রশ্নে এককথায় বলা যায় না যে, এই কোচিনিয়েল নিরাপদ নাকি অনিরাপদ।  যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) মূলত এই রং ব্যবহৃত পণ্যের গায়ে খুব স্পষ্ট করে রঙের ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করেছে।

 

কোচিনিয়েল পরীক্ষাগারে  চিহ্নিত হয়েছে ‘নন–টক্সিক’ বা ‘অবিষাক্ত’ হিসেবে।

আপনার মন্তব্যঃ

একই ধরনের সংবাদ

আপনার জন্য