বিস্তারিত

  • হোম
  • |
  • ষ্টিফেন হকিং ও তার বিস্ময়কর প্রযুক্তির  হুইলচেয়ারে গল্প। পার্ট ১  
thumb
ষ্টিফেন হকিং ও তার বিস্ময়কর প্রযুক্তির  হুইলচেয়ারে গল্প। পার্ট ১  
  • 1/11/2022 11:45:40 PM
  • মো: মোস্তাফিজার রহমান
  • 0 - Comments

এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে, বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর নাম একবার হলেও শোনেনি এমন সাধারণ কিংবা অসাধারণ মানুষ, বিজ্ঞানমনষ্ক অথবা অবিজ্ঞানমনষ্ক , যে টাইপের মানুষই হোক না কেন। যিনি  সৃষ্টিতত্ত্ব বা কসমোলজি নিয়ে আজীবন গবেষণা করে গেছেন। যিনি পুরো মহাবিশ্বকে এক সূত্রে বাঁধতে চেয়েছিলে আর বের করে আনতে চেয়েছিলেন আমাদের এই মহাজাগতিক রহস্যময় মহাবিশ্বের উৎপত্তির কারণ, তিনি অন্য কেউ নন তিনি হলেন বিজ্ঞানী  স্টিফেন হকিং। তিনি একাধারে  ‘দ্য ইউনিভার্স ইন এ নাটশেল’, ‘থিওরি অব এভ্রিথিং’, সর্বাধিক আন্তর্জাতিকভাবে বিক্রিত ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’   এবং ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’  নামক অমর গ্রন্থ লিখেছেন, সকল বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের কাছে সারা পৃথিবীব্যাপী  যা  সমানভাবে সমাদৃত।

২০১৮ সালের ১৪ মার্চ  আমাদের ছেড়ে সেই প্রতিভাধর বিজ্ঞানী পরপারে চলে গেলেন। অবাক লাগে ভাবতেই যে,  আজ থেকে প্রায় ৩৩ বছর আগে যে  মানুষটির মৃত্যু হওয়ার কথা ছিলো অথচ  পরবর্তী ৩৩টি বছর  সেই বেঁধে দেয়া সময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে জীবিত ছিলেন বিজ্ঞানের প্রতি  সেই মানুষটি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন তার জীবনের শেষ সময়গুলোর সবটুকু  বিজ্ঞান সাধনার কাজে, এবং শেষমেষ ৭৬ বছর বয়সে তিনি আমাদের ছেড়ে  চলে গেলেন।

একটু রহস্যময় হকিং এর জন্ম ও মৃত্যুর তারিখগুলো । হকিং এর  জন্ম তারিখ ছিল  ১৯৪২ সালের ৮ই  জানুয়ারি। কি আচার্য ব্যাপার তার জন্ম তারিখ থেকে ঠিক ৩০০ বছর পূর্বে  ১৬৪২ সালের একই দিনে অর্থাৎ ৮ই জানুয়ারির  ১৬৪২ তারিখে খ্যাতিমান  বিজ্ঞানী গ্যালিলিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আবার যেদিন তিনি  মৃত্যু বরণ করেন, অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ, ১৮৭৯ সালের জন্মগ্রহণ করেছিলেন আপেক্ষিকতার জনক বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। আবার পাই দিবস পালন করা হয় ওই একই দিন । অনেকটা কাকতালীয় ও অদ্ভুত ব্যাপার হলে এমন হয়।

যদিও   এই লেখার উপজীব্য নয়  তাঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করা । তারপর একটু জানাথাকলে মন্দও হয় না।  তিনি যখন ২১ বছর বয়সী  তখন ক্যামব্রিজ বিশ্ববদ্যালয়ে কসমোলজির উপর তিনি  পড়াশোনা ও গবেষণা করতেন । হঠাৎ হঠাৎ সেই সময় থেকেই   পানির গ্লাস পড়ে যেত তাঁর হাত থেকে, গলার স্বর পরিবর্তিত হয়ে যেত  বক্তৃতা দেয়ার সময় , পিছলে যেতেন হাঁটতে গিয়ে 
 কিংবা হাত ফস্কে যেত জুতার ফিতা বাঁধতে গিয়ে । একসময়  বিষয়টা মারাত্মক 
 রূপে আবির্ভাব হলো।  তার শরীরে এ্যামিওট্রোফিক ল্যাটারাল স্লেরোসিস  ধরা পড়লো যাকে লু গেরি’স ডিজিজ ও বলা হয়।

যে স্নায়ুগুলো মাংসপেশীসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে  বলতে গেলে সাধারণভাবে লু গেরি’স ডিজিজ  আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে সেই স্নায়ুগুলো শিথিল হয়ে পড়তে শুরু করে  আস্তে আস্তে।  একেবারে নিস্তেজ হয়ে যায় একসময় । অর্থাৎ নিজের শরীরের মাংসপেশী নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হয়ে পড়ে লু গেরি’স ডিজিজ  আক্রান্ত ব্যক্তি । জানা যায় ডাক্তারগণ হকিং  এর এই লু গেরি’স ডিজিজ  আক্রান্ত  হওয়ার পর তার বেঁচে থাকার সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। সময় বেঁধে দিয়ে হকিং কে  বলা হয়েছিলো মাত্র আড়াই বছর বেঁচে থাকবেন তিনি।  হকিং কিন্তু এতে থেমে থাকেননি। হকিং 
 সৃষ্টিতত্ত্বের গবেষণায় এবং পদার্থবিদ্যা গবেষণায়  মন দেন। 

তাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে লু গেরি’স ডিজিজ  আক্রান্ত হওয়ার প্রথম দিকে । হকিং  ঠিকভাবে কথা বলতে ও নড়াচড়া করতে পারতেন না মোটেও, তার  শুধু  ডানহাতের দুটি আঙ্গুল  এবং মস্তিষ্ক  ছিলো কর্মক্ষম। হকিং  আজীবনের মত আশ্রয় নিলেন সেই বিস্ময়কর হুইল চেয়ারে।

হুইলচেয়ারে আশ্রয় নেয়ার প্রথমদিকে একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়নি তাঁর গলার স্বর। কিন্তু  খুবই অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিলো তাঁর গলার স্বর সেইসাথে সাধারণদের বোঝার পক্ষেও ছিল দুষ্কর। তারাই কেবল কোনোরকম বুঝতে পারতেন তার কথা যারা তাঁকে খুব কাছে থেকে চিনতো। তাঁরই একজন ছাত্র সেসময়  তার গবেষণার কাজে তাঁকে সাহায্য করতো। কিন্তু  তিনি তাঁর গলার স্বর পুরোপুরি হারিয়ে ফেললেন শ্বাসনালীতে ১৯৮৫ সালে অস্ত্রোপচার করার পর।

গলার স্বর হারানোর পরেই যত বিপত্তি দেখা দেয়  তার গবেষণায়। তিনি আর চালিয়ে যেতে পারছিলেন না তাঁর গবেষণা । ঠিক তখনই তাঁর এই কঠিন অবস্থা নজর কাড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসরত একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামারের। এই কম্পিউটার প্রকৌশলী তার জন্য এমন একটি  কথা বলার সফটওয়্যার তৈরী করেছিলেন  যা  কাজ করতে পারতো মানুষের চোখ এবং মাথার অবস্থার পরিবর্তন বা নড়াচড়ার নির্দেশনা অনুসরণ করে । এই অসম্ভব আবিষ্কারের ফল হকিংএর জন্য  কিছুটা সুবিধার কারণ হয়। তিনি কম্পিউটার স্ক্রীন থেকে যে  কোনো শব্দকে ঠিক করার পর সেটা নির্বাচিত হতো ও পরবর্তীতে তা আবার ভয়েস সিন্থেসাইজার এর মাধ্যমে অডিও করে শুনতে প্রোগ্রাম করা হয়েছে। অনেকটা বলতে গেলে এখন গুগল ট্রান্সলেটর এ যেভাবে  অডিও প্রোগ্রামের মাদ্ধমে কাজ করা হয়। 

কিন্তু তার যে হাতের আঙ্গুল দুটো নড়াচড়া করে ডিভাইস চালাতেন আঙ্গুল দুটিও ২০০৮ সালের দিকে প্রোগ্রাম চালানোর মতো অবস্থায় থাকে না আর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রোগ্রামটি এমনভাবে সেট করা হয় যার দ্বারা হকিং গাল ও তার চোয়ালের নাড়াচাড়া এর সাহায্যে ওই  প্রোগ্রামটি চালাতে পারতেন। তাঁর জন্য হকিংয়ের চোয়ালে লাগিয়ে দেয়া হয়  এক বিশেষ সেন্সর, এই  সেন্সর এর অপর প্রান্ত তার চশমার সাথে যুক্ত।

আপনার মন্তব্যঃ

একই ধরনের সংবাদ

আপনার জন্য