বাংলাদেশের নদী ও নদীকেন্দ্রিক জনপদের জীবন কাছ থেকে দেখার লক্ষ্য নিয়ে এক ব্যতিক্রমী পদযাত্রায় বের হয়েছিলেন এক পরিব্রাজক। কুড়িগ্রামের রৌমারি থেকে শুরু করে ভোলার কুকরি-মুকরি চর পর্যন্ত টানা ১৮ দিনে প্রায় ৬৩০ কিলোমিটার পথ হেঁটে তিনি সম্পন্ন করেন এই অনন্য ভ্রমণ।
নদীর পথ ধরে অনিশ্চিত যাত্রা
এই দীর্ঘ যাত্রার শুরু হয় কুড়িগ্রামের একটি চর এলাকা থেকে। নির্দিষ্ট কোনো রাস্তা না থাকায় পুরো পথই ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। মানচিত্রে যে পথ দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার অনেকটাই অচল বা অনির্ভরযোগ্য ছিল। ফলে স্থানীয় মানুষের পরামর্শ ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করেই এগিয়ে যেতে হয়েছে।
এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধু ভ্রমণ নয়—নদী তীরবর্তী মানুষের জীবনযাপন, সংগ্রাম এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র জানা।
৬ বিভাগে ১২ জেলার অভিজ্ঞতা
১৮ দিনের এই যাত্রায় তিনি দেশের ৬টি বিভাগের অন্তত ১২টি জেলার নদীপথ অতিক্রম করেন। পথে পড়ে যমুনা, পদ্মা ও মেঘনার বিভিন্ন চর এলাকা, যেখানে প্রতিনিয়ত বদলে যায় নদীর গতিপথ ও জনজীবন।
কখনো শুকনো নদীখাতে চাষাবাদ, আবার কোথাও কাদা আর পানিপথ পার হতে হয়েছে নৌকায়। ১৫টিরও বেশি খাল পার হতে হয়েছে হাঁটা কিংবা নৌকার সাহায্যে।
পথে পথে মানুষের ভালোবাসা
এই অভিযানে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা। অনেক মাঝি ও খেয়াঘাটের মানুষ কোনো ভাড়া ছাড়াই সাহায্য করেছেন। কোথাও কৃষকের সঙ্গে বসে খাবার, কোথাও জেলেদের সঙ্গে মাছের ঝোল—এই অভিজ্ঞতাগুলোই যাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
চ্যালেঞ্জ, ভয় ও অদ্ভুত অভিজ্ঞতা
নদীপথে হাঁটার সময় নানা ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ, কখনো অচেনা জায়গায় বিপদে পড়া—সবকিছুই ছিল এই যাত্রার অংশ। একবার ভুল বোঝাবুঝিতে একটি পরিত্যক্ত ভবনে গিয়ে পড়েন, পরে স্থানীয়দের সহায়তায় নিরাপদ আশ্রয় পান।
পরিবেশ সচেতনতার বার্তা
এই দীর্ঘ পদযাত্রার মাধ্যমে নদীর অববাহিকার পরিবর্তন, জলবায়ুর প্রভাব এবং নদীভাঙনের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, মাছের সংকট ও চরবাসীর জীবনসংগ্রাম—সবই কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে এই অভিযানে।
একটি ব্যতিক্রমী ভ্রমণের গল্প
শেষ পর্যন্ত ভোলার কুকরি-মুকরি চরে পৌঁছে শেষ হয় এই ৬৩০ কিলোমিটারের যাত্রা। এটি শুধু একটি ভ্রমণ নয়—বরং নদী, মানুষ ও প্রকৃতির এক জীবন্ত দলিল, যা বাংলাদেশের ভ্রমণ ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নিতে পারে।


